প্রাণিখজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ও অনন্য প্রাণী হচ্ছে মানুষ । মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম Homo sapiens ( L. homo = man + sapiens = to be wise ) ; অর্থাৎ বুদ্ধিমান মানুষ । স্তন্যপায়ীর যে বর্গ ( Order ) - এ মানুষ অবস্থিত তাকে বলে প্রাইমেটস ( Primates ) । প্রাইমেটস বর্গে রয়েছে বানর , নর - বানর ( ওরাংওটান , গরিলা , গিবন , শিম্পাঞ্জী ) , মানুষ এবং মানবসদৃশ অন্যান্য প্রাণী । ত্রিশ লক্ষ বছর পূর্বে মানুষের পুর্ব - পুরুষের যে দলটি আধুনিক মানবগোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে সে দলটি ছাড়া অন্যান্য শাখার নর - মানব বিভিন্ন সময়ে অবলুপ্ত হয়ে গেছে । যে সকল হোমিনিডি ( Hominidae )গোত্র পাথর ভেঙ্গে হাতিয়ার তৈরি করত অথবা গাছের ডাল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত তাদেরকে প্রকৃত মানুষ বলে গণ্য করা হয় । আর যারা প্রাকৃতিক পদার্থ ইচ্ছানুযায়ী রূপান্তরিত করে নির্দিষ্ট ধরনের হাতিয়ার তৈরি করতে পারত তাদেরকে বলা হতো সুপরিণত মানুষ ।
হোমিনিডির প্রারম্ভিক ইতিহাস আমাদের অজানা । আর্মস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড : ইউজেন দুবোয়া মানুষের অতীত ইতিহাসের সন্ধান সুমাত্রায় না পেয়ে তিনি যান জাভায় । সেখানে নদীগর্ভে তিনি অনেক জীবাশ্ম ( fossil ) পান । এদের হাড় পরীক্ষা করে দেখা যায় , এরা হাঁটতে জানত । এদের নেমে আসা কপাল , কুঞ্চিত ভূ এবং তার নিচে চোখের গর্ত দেখতে বানরের মত । এদের মগজের পরিমাণ ছিল 900-1000cc । আধুনিক নর - বানরের করোটির ধারক 600cc । বিজ্ঞানীরা এ নর - বানরের নাম রাখেন Pithecanthropus ( জাভা মানুষ ) । নর - বানর মানুষের পূর্বপুরুষ নয় । তারা মানুষের পূর্ব পুরুষের ভিন্ন ধারা । তারপর চীনের রাজধানী পিকিং শহরের ৩০ মাইল দক্ষিণে একটি গুহার তলদেশে মানুষের একটি খুলি ও হাত আবিষ্কৃত হয় । পিকিং –এ পাওয়া মানুষের নাম রাখা হয় Sinanthropus ( পিকিং মানুষ ) । জাভা মানুষের সাথে এর মিল এত বেশি যে , বিজ্ঞানীরা এদেরকে এক প্রজাতিভুক্ত করে তার নাম দেন খাড়া মানুষ , Homo erectus মানুষের জীবাশ্ম পাওয়া যায় জার্মানির হাইডেলবার্গ শহর , ইতালি , দক্ষিণ ফ্রান্স এবং আফ্রিকায় । পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল হতে মানুষের কঙ্কাল আবিষ্কৃত হওয়ায় বিজ্ঞানীরা মনে করেন কোন নির্দিষ্ট জায়গায় মানুষ জন্মেনি । বিশ্বের বিভিন্ন অংশে এদের বিস্তৃতি ঘটেছে মাত্র দশ হাজার বছর পূর্বে ।
মানুষের শ্রেণীবিন্যাস
শ্রেণীতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ( Man as a mammal )
অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মতো মানুষের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান
১। নোম ( Hair ) মানুষের দেহ হালকা লোম দিয়ে আবৃত , পায়ের তলা , হাতের তালু ও মুখমণ্ডল লোমবিহীন ।
২। স্তনগ্রন্থি( Manmary gland ) : বক্ষদেশে এক জোড়া স্তন গ্রন্থি স্ত্রী - পুরুষ উভয় দেহে বর্তমান । তবে স্ত্রীদের ক্ষেত্রে এ গ্রন্থি কার্যকর এবং পুরুষে নিষ্ক্রিয় থাকে ।
৩। মধ্যচ্ছদা ( Diaphragm ) : বক্ষ ও উদরের মাঝখানে পেশীবহুল মধ্যচ্ছদা থাকে যা বহিঃশ্বসন নিয়ন্ত্রণ করে ।
৪। কর্ণ ( Ear ) : বহিঃকর্ণে পিনা , মধ্যকর্ণে তিনটি ক্ষুদ্রাষি ও অন্তঃকর্ণে কক্লিয়া বিদ্যমান ।
৫। রক্তসংবহন তন্ত্র ( Blood circulatory system ) : এটি উন্নত ও বদ্ধ প্রকৃতির; হৃৎপিণ্ড সম্পূর্ণভাবে চারপ্রকোষ্ঠী এবং লোহিত কণিকা নিউক্লিয়াসবিহীন ।
৬। দন্তবিন্যাস ( Dentition ) : হেটেরোডন্ট প্রকৃতির অর্থাৎ চোয়ালে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন চারধরনের দাঁত থাকে ।
৭। মস্তিষ্ক ( Brain ) : মস্তিষ্ক সুগঠিত এবং সর্ববৃহৎ ( ১৩০০-১৪৫০ সিসি ) , সেরেব্রাল হেমিস্ফিয়ার সুবিকশিত ।
অন্যন্য বৈশিষ্ট্য ( Unique characters )
প্রোসিমিয়ান জাতীয় আদিতম প্রাইমেট থেকে মানুষের উৎপত্তি পর্যন্ত যে সব পরিবর্তিত বিশেষ গুণ মানুষ অর্জন করেছে সেগুলোই মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য । নিচে তা উল্লেখ করা হলো :
১। চলন: শুধু মানুষই পুরোপুরি দুপায়ে হাঁটতে সক্ষম ।
২। ঘ্রাণ ও দৃষ্টিশক্তি: মানুষ মূলত দিবাচর বলে এদের দৃষ্টিশক্তি বিকশিত হয়েছে , ঘ্রাণশক্তির উপর নির্ভরশীলতা কমেছে । মানুষের দুচোখের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্য দেখার ক্ষমতা ( stereoscopic vision ) আছে ।
৩। মস্তিষ্কের বিকাশ: বিবর্তনজনিত দৃষ্টিশক্তির বিকাশ ও হাত - পায়ের ব্যবহারের সাথে সাথে এসেছে মস্তিষ্কের বিকাশ , বিশেষ করে সেরেব্রাল কর্টেক্সের বিকাশ । এমন পরিণত ও বড় মস্তিষ্ক অন্য কোনো স্তন্যপায়ীতে নেই । ফলে চিন্তা ও বুদ্ধিভিত্তিক ক্ষমতার দাপটে মানুষ সমগ্র পৃথিবী জয় করতে পেরেছে ।
মানব বিবর্তনের প্রধান ধাপসমূহ ( Hickman et al . 2006 অনুসরণে )
| [সাহেলানথ্রোপাস চাদেনসিস] |
0 মন্তব্যসমূহ